বাংলাদেশে প্রায় ৩০ হাজার কন্যাশিশু বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে বলে এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের Trafficking in Persons (TIP) Report-এর বরাতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, যৌন পেশায় যুক্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৪৫ শতাংশ শৈশবেই এ পেশায় প্রবেশ করতে বাধ্য হয়েছেন। এসব তথ্য শিশুদের নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে অল্প বয়সে শিশুদের শোষণের শিকার হওয়া তাদের স্বাভাবিক বিকাশ, শিক্ষা, মানসিক সুস্থতা ও ভবিষ্যৎ জীবনকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেমের ফাঁদ, চাকরির প্রলোভন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আড়ালে শিশুদের যৌন শোষণের ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে। উন্নত জীবন, ভালো চাকরি কিংবা আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়ে অসহায় ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের প্রতারণার মাধ্যমে শোষণের দিকে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা শিশুদের বিশ্বাস অর্জন করে তাদের দুর্বলতার সুযোগ নেয়। ফলে প্রতারণা ও শোষণের শিকার হওয়ার পরও অনেক শিশু ভয়ে, সামাজিক চাপের কারণে কিংবা প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে মুখ খুলতে পারে না।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মও শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করার মাধ্যম হয়ে উঠছে। অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে অনলাইন যোগাযোগ, ভুয়া পরিচয়, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি এবং ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি সংগ্রহের মাধ্যমে শিশুদের বিপদের মধ্যে ফেলার আশঙ্কা রয়েছে। তাই শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ শনাক্ত ও প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতন করা এবং কোনো সন্দেহজনক প্রস্তাব বা আচরণের মুখোমুখি হলে বিশ্বস্ত অভিভাবক কিংবা দায়িত্বশীল ব্যক্তির সাহায্য নেওয়ার বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
শিশুদের যৌন শোষণ কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সংকট নয়; এটি একটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। এর পেছনে দারিদ্র্য, সামাজিক অসহায়ত্ব, নিরাপদ কর্মসংস্থানের অভাব, সচেতনতার ঘাটতি এবং অপরাধীদের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের মতো বিভিন্ন বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কোনো পরিস্থিতিই শিশুর প্রতি শোষণকে বৈধতা দিতে পারে না। বরং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে শোনা এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক শ্রম থেকে বছরে প্রায় ২৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধ মুনাফা অর্জিত হয়। এর মধ্যে আনুমানিক ১৭২ বিলিয়ন ডলার আসে বাণিজ্যিক যৌন শোষণ থেকে। এ পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, মানব শোষণ শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, এটি একটি বৃহৎ অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িত। বিপুল অর্থের লোভে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র শিশু ও অসহায় মানুষকে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে তদন্ত, নজরদারি, আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা এবং অপরাধলব্ধ অর্থের উৎস অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামাজিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সন্দেহজনক নিয়োগপ্রক্রিয়া, শিশু পাচারের ঝুঁকি এবং অনলাইনে প্রলোভন দেখানোর ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি ভুক্তভোগী শিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, শিক্ষা অব্যাহত রাখার সুযোগ এবং সামাজিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে এ সমস্যার প্রকৃত ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা এবং প্রতিরোধমূলক নীতিমালা কার্যকর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী শিশুদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে, যাতে তারা নতুন করে সামাজিক অপমান বা হয়রানির শিকার না হয়।
শিশুরা একটি দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের শৈশব কেড়ে নেওয়া মানে শুধু একটি শিশুর জীবন বিপর্যস্ত করা নয়, বরং সমাজের ভবিষ্যৎকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলা। তাই শিশুদের যৌন শোষণ ও মানব পাচার প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগীদের মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
তথ্যসূত্র: মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের Trafficking in Persons (TIP) Report এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)।