বৃষ্টি নামলেই নগরজীবনের পরিচিত আতঙ্ক—জলাবদ্ধতা। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই অনেক সড়ক, অলিগলি কিংবা আবাসিক এলাকার রাস্তায় জমে যায় হাঁটুসমান পানি। কোথাও পানি নামতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, আবার কোথাও দিনের পর দিনও লেগে যায়। এর পেছনে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত নিষ্কাশনব্যবস্থা ও ড্রেনেজ সমস্যার পাশাপাশি বড় একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ড্রেনে নির্বিচারে ময়লা-আবর্জনা ফেলা।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকার ড্রেন ঘুরে দেখা যায়, পানি প্রবাহের পথ দখল করে আছে পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের উচ্ছিষ্ট, কাগজ, কাপড়সহ নানা ধরনের বর্জ্য। কোথাও আবার ড্রেনের ওপর বা আশপাশে এমনভাবে ময়লা জমে আছে, দেখে বোঝার উপায় নেই এটি পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, নাকি ময়লা ফেলার জায়গা।
শুধু বর্জ্য ফেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, কিছু স্থানে পথচারী, রিকশাচালক কিংবা বিভিন্ন যানবাহনের চালকদের অসচেতন আচরণও ড্রেনের পরিবেশকে আরও নোংরা করে তুলছে। ফলে একদিকে যেমন দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, অন্যদিকে বর্জ্য জমে ড্রেনের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।ড্রেনে প্লাস্টিক ও পলিথিন জমে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেলে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দীর্ঘসময় জমে থাকা নোংরা পানিতে নানা ধরনের জীবাণু জন্মানোর সুযোগ তৈরি হয়। মানুষ বাধ্য হয়ে সেই দূষিত পানির মধ্য দিয়ে চলাচল করলে ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা, চুলকানি,চর্মরোগ ও সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তবে সমস্যাটি শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়। গ্রামাঞ্চলে যেখানে ড্রেনেজ ব্যবস্থা তুলনামূলক কম, সেখানে খাল-বিল ও জলাশয়ই পানি নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কিন্তু সেখানেও মানুষের অসচেতনতার কারণে প্রতিনিয়ত ফেলা হচ্ছে পলিথিন, প্লাস্টিক ও গৃহস্থালির বর্জ্য। বছরের পর বছর বর্জ্য জমতে জমতে অনেক খাল নাব্যতা হারাচ্ছে, সংকুচিত হচ্ছে পানি প্রবাহের পথ। একসময়কার স্বচ্ছন্দ জলপ্রবাহের খাল ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে ময়লা-আবর্জনায় ভরা মৃত জলাশয়ে।
প্রশ্ন হলো এই দায় কি শুধু রাষ্ট্রের না কি নাগরিকদের ?
প্রশাসনের দায়িত্ব রয়েছে ড্রেন পরিষ্কার রাখা, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ করা এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানে কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্বও কম নয়। আমরা যদি নিজেরাই ড্রেনে পলিথিন, প্লাস্টিক কিংবা গৃহস্থালির বর্জ্য ফেলি, তাহলে শুধু কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
একটি ড্রেন একদিনে ডাস্টবিনে পরিণত হয় না। প্রতিদিনের ছোট ছোট অসচেতনতার ফলেই একসময় বন্ধ হয়ে যায় পানি চলাচলের পথ। এরপর বৃষ্টির পানি যখন রাস্তায় জমে যায়, তখন আমরা জলাবদ্ধতার জন্য শুধু কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করি।
অথচ প্রশ্নটা আগে নিজেদের করা দরকার ‘ড্রেনটা বন্ধ করল কে?’
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয় এটি নাগরিক দায়িত্বও। ড্রেনে ময়লা না ফেলা, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলা এবং অন্যদেরও সচেতন করা। এই ছোট ছোট দায়িত্বশীল আচরণই পারে বড় একটি সমস্যা প্রতিরোধ করতে।কারণ, ড্রেন পানি নামানোর জন্য ময়লা জমিয়ে জলাবদ্ধতা তৈরির জন্য নয়। আর পরিচ্ছন্ন শহর বা গ্রাম শুধু সরকারের উদ্যোগে নয়, আমাদের প্রত্যেকের সচেতন হাতেই গড়ে উঠতে পারে।