পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর, পবিত্র ও আবেগময় ডাকটি হলো ‘মা’। এই একটি ছোট্ট শব্দের মাঝেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সবটুকু নিরাপদ আশ্রয় আর প্রশান্তি। প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত মর্যাদার সাথে ‘বিশ্ব মা দিবস’ পালন করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় আজ রবিবার সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও গভীর আবেগ, বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপিত হচ্ছে। মায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য একটি বিশেষ দিন নির্ধারণ করার এই চলটি মূলত শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের আনা জার্ভিসের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়, যা আজ গোটা বিশ্বের মানুষের কাছে এক সার্বজনীন ও আবেগের উৎসবে পরিণত হয়েছে।
মা কেবল একজন জন্মদাত্রী নন, তিনি একজন সন্তানের জীবনের প্রথম শিক্ষক, নিরাপদ আশ্রয়স্থল, অকৃত্রিম বন্ধু এবং সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। সন্তানের মঙ্গলের জন্য নিজের সমস্ত চাওয়া-পাওয়া, ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও আরামকে হাসি মুখে বিসর্জন দেন একজন মা। নিজের সব কষ্ট সযত্নে আড়াল করে সন্তানের একটি সুন্দর ও সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নির্মাণে তার এই আত্মত্যাগ পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আধুনিক সমাজে মায়েরা শুধু ঘরের চারদেয়ালেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং পরিবার সামলানোর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রেও তারা রাখছেন অভাবনীয় সাফল্যের স্বাক্ষর। এত শত ব্যস্ততার মাঝেও সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহ, শাসন ও যত্নের কোনো কমতি দেখা যায় না।
আমাদের বর্তমান যান্ত্রিক ও তুমুল ব্যস্ত জীবনে প্রিয়জনদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সুযোগ দিন দিন অনেক কমে যাচ্ছে। তবে মা দিবস যেন সেই না বলা ভালোবাসা এবং গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক চমৎকার সুযোগ তৈরি করে দেয়। এদিন কেউ মায়ের পাশে বসে একান্ত সময় কাটাচ্ছেন, কেউবা ভালোবেসে মায়ের পছন্দের উপহার, ফুল বা শাড়ি তুলে দিচ্ছেন। আবার পড়াশোনা বা জীবিকার তাগিদে যেসব সন্তান দূরে বা প্রবাসে আছেন, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও কল বা টেলিফোনের সাহায্যে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিবেদন করছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোও দিনটিকে ঘিরে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করেছে।
তবে এই আনন্দঘন দিনটি উদযাপনের পাশাপাশি আমাদের সমাজের একটি রূঢ় বাস্তবতার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। সমাজের অনেক স্থানেই মায়েরা অবহেলার শিকার হচ্ছেন, এমনকি অনেকের জীবনের শেষ আশ্রয় হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রম। সচেতন মহল ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, মায়ের প্রতি এই অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন কেবল একদিনের আনুষ্ঠানিকতার ফ্রেমে বন্দি থাকা উচিত নয়। বরং মায়ের অধিকার নিশ্চিত করা এবং শেষ বয়সে তাদের পরম যত্নে পাশে থাকা প্রতিটি সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। পরিবারের সার্বিক সুখ, সন্তানের জীবনের প্রকৃত সাফল্য এবং একটি সুস্থ, সুন্দর ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণে মায়ের অবদান সম্পূর্ণ অপরিমাপযোগ্য। তাই বছরের ৩৬৫ দিনই মায়ের প্রতি যত্নশীল হওয়া আমাদের সকলের একান্ত কর্তব্য।
আজকের এই বিশেষ দিনে পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি জানাচ্ছি অফুরন্ত ভালোবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধা। পৃথিবীর কোনো মূল্যবান উপহার বা আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে মায়ের ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। তবে আমাদের সামান্য ভালোবাসা, সম্মান ও একটুখানি সময় তাদের মুখে এনে দিতে পারে পরম তৃপ্তির হাসি। প্রতিটি মা যেন আজীবন সুস্থ, নিরাপদ এবং চূড়ান্তভাবে সম্মানিত থাকেন— বিশ্ব মা দিবসে এটাই হোক আমাদের সকলের ঐকান্তিক প্রার্থনা।