আফসানা মিম, ঢাকা
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় নদী। পটুয়াখালীর দিয়ে প্রবাহিত এই নদী দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। একসময় প্রাণচঞ্চল এই নদী ছিল স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের প্রধান জীবিকার উৎস এবং ইলিশসহ নানা সামুদ্রিক ও স্বাদুপানির মাছের নিরাপদ প্রজননক্ষেত্র। তবে বর্তমানে নাব্যতা সংকট, পলি জমা, অবৈধ দখল ও দূষণের কারণে নদীটি ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক রূপ ও অস্তিত্ব হারানোর পথে।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দশক আগেও আন্ধারমানিক নদী ছিল গভীর, প্রশস্ত ও প্রবল স্রোতস্বিনী। সমুদ্রঘেঁষা এই নদীতে জোয়ারের সময় পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেত এবং ভাটার সময় স্বাভাবিকভাবে পানি নেমে গিয়ে নদীর গতিপ্রবাহ বজায় থাকত। এই প্রাকৃতিক জোয়ার-ভাটার চক্র নদীর তলদেশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি মাছের প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করত। সে সময় জেলেরা প্রতিদিন নদীতে নেমে বিপুল পরিমাণ মাছ আহরণ করতেন, যার মধ্যে ইলিশ ছিল অন্যতম।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীতে অতিরিক্ত পলি জমে এর বহু অংশ ভরাট হয়ে গেছে। ফলে নদীর নাব্যতা কমে গিয়ে অনেক জায়গা অগভীর হয়ে পড়েছে এবং কোথাও কোথাও প্রায় স্থায়ীভাবে শুকিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ার বিরূপ প্রভাব পড়েছে এর সঙ্গে সংযুক্ত খাল ও স্লুইস গেটগুলোর ওপরও। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর সঙ্গে সংযুক্ত একাধিক খাল ও স্লুইস গেট বর্তমানে পানির স্বল্পতার কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এতে কৃষিজমিতে সেচ ব্যবস্থায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে, আবার কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতার সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। ফলে কৃষকদের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বাড়ছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
একসময় আন্ধারমানিক নদী ইলিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভয়াশ্রম হিসেবেও পরিচিত ছিল। উপকূলীয় নদীগুলোর মধ্যে এটি ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করত। কিন্তু বর্তমানে নদীর নাব্যতা হ্রাস, পানির প্রবাহ কমে যাওয়া ও দূষণের কারণে মাছের প্রজনন পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় জেলেরা জানান, যেখানে আগে প্রচুর ইলিশ ও অন্যান্য মাছ পাওয়া যেত, এখন সেখানে মাছের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে এলাকার হাজারো জেলে পরিবার জীবিকা সংকটে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীটির বর্তমান সংকটের পেছনে রয়েছে একাধিক মানবসৃষ্ট কারণ। দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া, নদীর তীর দখল করে অবৈধ বসতি ও স্থাপনা নির্মাণ, কৃষিতে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার এবং প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন কঠিন ও তরল বর্জ্য নদীতে ফেলার ফলে এর স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে।
নদীর ওপর অবকাঠামোগত চাপও ক্রমেই বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, মাত্র প্রায় ১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীপথের মধ্যে তিনটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নাব্যতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এছাড়া নদীর তীরবর্তী এলাকায় সম্প্রতি একটি হেলিপোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে, যা প্রশাসনিক ও যোগাযোগ সুবিধা বাড়ালেও নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা।
এ অঞ্চলের কাছেই অবস্থিত দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর হিসেবে এর গুরুত্ব বাড়লেও বন্দরকেন্দ্রিক দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়ন আন্ধারমানিক নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রবাহ ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
নদীটি রক্ষার দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দা, জেলে ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ইতোমধ্যে একাধিকবার মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন। এবং -এর উদ্যোগে নদী রক্ষায় সচেতনতা কর্মসূচি ও মানববন্ধন আয়োজন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচি থেকে দ্রুত নদী পুনঃখনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং দূষণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
স্থানীয়দের মতে, সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে ঐতিহ্যবাহী আন্ধারমানিক নদী একসময় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। তাই নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের জোরালো দাবি।