পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের পাখিমারা এলাকায় অবস্থিত পানি জাদুঘর বাংলাদেশের এক ব্যতিক্রমধর্মী ও গৌরবময় স্থাপনা। দেশের প্রথম এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম পানি জাদুঘর হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি নদী, পানি, পরিবেশ ও সভ্যতার ইতিহাস সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি আবর্তিত হয়েছে নদীকে ঘিরে। সেই নদীর গল্প, পানির গল্প এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই অনন্য জাদুঘর। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে দেশের বিভিন্ন আন্তঃসীমান্ত নদীর পানিসহ দেশ-বিদেশের মোট ৮৭টি নদীর পানির নমুনা, যা জাদুঘরটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
জাদুঘরের কাঁচের বোতলগুলোতে সংরক্ষণ করা হয়েছে বাংলাদেশের প্রধান নদী পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা, করতোয়া, আত্রাই, মহানন্দা, ধলেশ্বরী, কর্ণফুলী, সুরমা, কুশিয়ারাসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানি। এছাড়াও ভারত, নেপাল ও মিয়ানমারসহ প্রতিবেশী দেশের কয়েকটি নদীর পানির নমুনাও এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। প্রতিটি নমুনার সঙ্গে রয়েছে সংশ্লিষ্ট নদীর পরিচিতি, ইতিহাস এবং ভৌগোলিক তথ্য।
শুধু পানির নমুনাই নয়, জাদুঘরে রয়েছে বাংলাদেশের নদ-নদীর মানচিত্র, নদীভাঙনের চিত্র, উপকূলীয় অঞ্চলের জীবনধারা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, পানিদূষণ, নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নানা তথ্যসমৃদ্ধ প্রদর্শনী। এসব সংগ্রহ দর্শনার্থীদের সামনে পানির গুরুত্ব ও পরিবেশ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং সুপেয় পানির সংকট ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় পানি জাদুঘর শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং পরিবেশ সচেতনতা ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। প্রতিবছর অসংখ্য শিক্ষার্থী, গবেষক, পরিবেশবিদ ও পর্যটক এখানে এসে নদী ও পানিসম্পদ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন।
পর্যটন নগরী কুয়াকাটার কাছাকাছি হওয়ায় পানি জাদুঘরটি পর্যটকদের কাছেও ব্যাপক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। সমুদ্রসৈকত ভ্রমণের পাশাপাশি দর্শনার্থীরা এখানে এসে বাংলাদেশের নদীমাতৃক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান।
বাংলাদেশের নদী ও পানিসম্পদের ইতিহাসকে ধারণ করে রাখা এই পানি জাদুঘর প্রকৃতি ও মানবসভ্যতার এক জীবন্ত দলিল। এর প্রতিটি প্রদর্শনী যেন বলে যায় নদীর গল্প, মানুষের গল্প এবং টিকে থাকার গল্প।
কাঁচের বোতলে সংরক্ষিত ৮৭টি নদীর পানি শুধু জলধারা নয়; এগুলো বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং নদীনির্ভর সভ্যতার নীরব সাক্ষী।