আজ বিশ্ব বাবা দিবস। পৃথিবীর কোটি কোটি সন্তানের কাছে দিনটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়, বরং ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও স্মৃতির এক আবেগঘন উপলক্ষ। জীবনের প্রতিটি ধাপে যিনি সন্তানের জন্য ছায়ার মতো পাশে থাকেন, নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের স্বপ্ন পূরণের জন্য সংগ্রাম করেন, সেই বাবাদের সম্মান জানাতেই প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্ব বাবা দিবস পালিত হয়।
একজন বাবার ভালোবাসা অনেক সময় শব্দে প্রকাশ পায় না। তিনি হয়তো খুব বেশি আদর করেন না, প্রতিদিন ‘ভালোবাসি’ বলেন না, কিন্তু সন্তানের সুখের জন্য নিজের সুখ ত্যাগ করতে কখনো পিছপা হন না। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করে যান, সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিজের ক্লান্তি, কষ্ট আর দুশ্চিন্তাকে আড়াল করে রাখেন। সন্তানের কাছে বাবা যেন এক বিশাল বটবৃক্ষ, যার ছায়ায় নিরাপদ থাকে পুরো পরিবার।
বিশ্ব বাবা দিবসের ইতিহাসও বেশ আবেগঘন। ১৯০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ভার্জিনিয়ার মোনোনগাহ কয়লাখনিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে শত শত শ্রমিক নিহত হন। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন সন্তানদের বাবা। সেই দুর্ঘটনায় অসংখ্য শিশু পিতৃহারা হয়ে পড়ে। নিহত বাবাদের স্মরণে আয়োজিত এক প্রার্থনাসভাকে বাবাদের সম্মান জানানোর ইতিহাসের প্রথম আয়োজন হিসেবে ধরা হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের সোনোরা স্মার্ট ডড নামের এক নারী তাঁর বাবার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একটি বিশেষ দিবস পালনের উদ্যোগ নেন। মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর বাবা একাই ছয় সন্তানকে বড় করে তুলেছিলেন। বাবার সেই অসাধারণ ত্যাগ ও ভালোবাসার স্বীকৃতি দিতেই তিনি বাবা দিবস চালুর দাবি জানান। তাঁর সেই উদ্যোগের ফলেই ১৯১০ সালের ১৯ জুন প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বাবা দিবস পালিত হয়। সময়ের পরিক্রমায় এটি বিশ্বের বহু দেশে পালিত একটি আন্তর্জাতিক দিবসে পরিণত হয়েছে।
জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতে একজন বাবা সন্তানের সাহস হয়ে দাঁড়ান।মাটির গভীরে ছড়িয়ে থাকা বটগাছের শিকড়ের মতো, বাবার ভালোবাসা আর আদর্শ আমাদের জীবনের ভিত গড়ে দেয়। আমরা যখনই ক্লান্ত বা বিভ্রান্ত হই, সেই শিকড়ের টানেই আবার ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি পাই। সন্তানের প্রথম স্কুলে যাওয়া থেকে শুরু করে কর্মজীবনের প্রথম পদক্ষেপ—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বাবার অবদান থাকে নীরবে। অনেক সময় সন্তান বড় হয়ে বুঝতে পারে, বাবার কঠোর শাসনের আড়ালেও লুকিয়ে ছিল গভীর মমতা, ভবিষ্যতের চিন্তা এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবার কাঁধে জমতে থাকে দায়িত্বের ভার, কিন্তু পরিবারের মুখের হাসি দেখলেই যেন তাঁর সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।
বর্তমান ব্যস্ত জীবনে আমরা অনেকেই বাবাকে সময় দিতে পারি না। প্রয়োজন ছাড়া হয়তো ফোনও করা হয় না। অথচ সেই মানুষটিই দিনের পর দিন সন্তানের খবরের অপেক্ষায় থাকেন, সন্তানের সাফল্যে গর্ববোধ করেন এবং সন্তানের কষ্টে নিঃশব্দে কাঁদেন। তাই বিশ্ব বাবা দিবস শুধু শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়, বরং বাবার প্রতি নিজের ভালোবাসা প্রকাশেরও একটি সুযোগ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাবা দিবস পালিত হচ্ছে। কেউ বাবার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্মৃতি ভাগাভাগি করছেন, আবার কেউ তাঁদের প্রয়াত বাবাকে স্মরণ করে আবেগঘন বার্তা দিচ্ছেন। তবে অনেকের কাছেই বাবা দিবসের সবচেয়ে বড় উপহার হলো বাবার পাশে থাকা, তাঁর খোঁজ নেওয়া এবং তাঁকে অনুভব করানো যে তিনি পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন।
অনেকে বলেন, বাবাদের জন্য আলাদা একটি দিনের প্রয়োজন নেই, কারণ প্রতিটি দিনই হওয়া উচিত বাবা দিবস। কথাটি সত্য হলেও বাস্তবতার ব্যস্ততায় আমরা প্রায়ই তাঁদের অবদান ভুলে যাই। তাই অন্তত একটি দিন বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উপলক্ষ হয়ে ওঠে।
আজকের এই দিনে পৃথিবীর সব বাবার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। যাঁরা এখনো সন্তানের মাথার ওপর ছায়া হয়ে আছেন, তাঁদের জন্য শুভকামনা; আর যাঁরা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁদের জন্য রইল বিনম্র স্মরণ।
“আমরা বড় হওয়ার পথে অনেক কিছু ভুলে যাই, কিন্তু বাবা কখনো তাঁর সন্তানকে ভুলে যান না। নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন, লুকানো কষ্ট আর হাজারো ত্যাগের বিনিময়ে তিনি গড়ে তোলেন সন্তানের ভবিষ্যৎ। পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার নাম—বাবা।”